আজ, শুক্রবার | ৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | সন্ধ্যা ৬:৩৬

ব্রেকিং নিউজ :
শরীয়তপুরের পথে পথে : মঠ, মসজিদ, মন্দির, জমিদারবাড়ি আর লোককথার এক বিস্মৃত ভূখণ্ড মাগুরায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মসজিদের মুয়াজ্জিনের মৃত্যু আবৃত্তি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন — সংস্কৃতি মন্ত্রী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব হলেন মাগুরার সন্তান মো. ওবায়দুর রহমান মাগুরায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে স্মৃতি স্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন মাগুরায় নবগঙ্গা নদী থেকে ১৮টি চায়না দোয়ারী জাল জব্দ মাগুরায় গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে এক ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু দেশজুড়ে পুলিশের রেড এলার্ট অ্যালামনাইয়ের হাল ধরলেন আবারও শিপন মাগুরায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দাবিতে গণমিছিল

শরীয়তপুরের পথে পথে : মঠ, মসজিদ, মন্দির, জমিদারবাড়ি আর লোককথার এক বিস্মৃত ভূখণ্ড

সঞ্জয় কুমার দত্ত : শরীয়তপুরে যাওয়ার আগে মনে হতে পারে, এটি বুঝি কেবল নদী, চর, গ্রাম আর সবুজের জেলা। কিন্তু পথের ধুলো পেরিয়ে, জনপদের ভেতর ঢুকে, একের পর এক পুরোনো স্থাপনার সামনে দাঁড়ালে সেই ধারণা বদলে যায়। এখানে ইতিহাস কোনো জাদুঘরের কাচের বাক্সে বন্দী নয়; ইতিহাস ছড়িয়ে আছে গ্রামের ভেতর, পুকুরের ঘাটে, বটগাছের শিকড়ে, মাটির নিচে, ভাঙা ইটের দেয়ালে এবং মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা লোককথায়।

কোথাও কয়েক শ বছরের পুরোনো মঠ আজও দাঁড়িয়ে আছে একাকী। কোথাও প্রাচীন জমিদারবাড়ির ভগ্ন ফটক পেরোলেই মনে হয়, সময় যেন হঠাৎ পেছনে ফিরে গেছে। কোনো দীঘির জলে মিশে আছে শতাব্দীপ্রাচীন কিংবদন্তি, আবার কোনো মন্দিরের প্রাঙ্গণে আজও ভক্তদের পদচারণায় জেগে থাকে পুরোনো আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। মুসলিম স্থাপত্যের প্রাচীন মসজিদ, হিন্দু মঠ-মন্দির, জমিদারি অট্টালিকা, সাধকদের আশ্রম—সব মিলিয়ে শরীয়তপুর যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনুলিখিত অধ্যায়।

এই ভ্রমণ সেই বিস্মৃত অধ্যায়টিই খুঁজে দেখার চেষ্টা।

রুদ্রকর মঠ: ভাঙনের মধ্যেও দাঁড়িয়ে ৩৫৩ বছরের ইতিহাস
শরীয়তপুর সদর উপজেলার রুদ্রকর এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১৫০ ফুট উঁচু একটি প্রাচীন বিহার বা মঠ। বয়স প্রায় ৩৫৩ বছর। এত দীর্ঘ সময় ধরে ঝড়-বৃষ্টি, রাজনৈতিক পালাবদল, জনপদের পরিবর্তন—সবকিছুর সাক্ষী হয়ে স্থাপনাটি আজও দাঁড়িয়ে আছে।

দূর থেকে দেখলে এর উচ্চতা ও কাঠামো এখনও বিস্মিত করে। কিন্তু কাছে গেলে চোখে পড়ে সময়ের ক্ষত। কোথাও ইট খসে পড়েছে, কোথাও দেয়ালে ফাটল। সবচেয়ে বড় সমস্যা—এই ঐতিহাসিক স্থাপনায় যাওয়ার মতো কোনো উপযুক্ত রাস্তা নেই। ফলে পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীরা আগ্রহী হলেও সহজে এখানে পৌঁছাতে পারেন না।

একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা শুধু তার দেয়াল নয়; সেখানে পৌঁছানোর পথটিও ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ। রুদ্রকর মঠের জন্য সেই পথটি তৈরি করা এখন জরুরি।

ধানুকা মনসাবাড়ি: ছয় শতকের স্মৃতি
শরীয়তপুরের ধানুকা গ্রামের মনসাবাড়ি—অনেকে যাকে ময়ূর ভট্টের বাড়ি নামেও চেনেন—প্রায় ছয়শ বছরের পুরোনো। একসময় এই অঞ্চলে মনসা পূজার অন্যতম প্রধান আয়োজন হতো এখানে। কথিত আছে, ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই পূজায় অংশ নিতে আসতেন। সেই থেকেই বাড়িটি পরিচিতি পায় ‘মনসাবাড়ি’ নামে।

সুলতানি ও মোগল আমলের নির্মাণশৈলীর প্রভাব রয়েছে এই স্থাপত্যে। বাড়ির চত্বরে রয়েছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ইমারত—দুর্গা মন্দির, মনসা মন্দির, সংস্কৃত টোল বা পাঠাগার, নহবতখানা এবং আবাসিক ভবন।

একসময় যেখানে ধর্মীয় আয়োজন, শিক্ষাচর্চা ও সামাজিক জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, আজ সেখানে সময়ের ক্ষত স্পষ্ট। সংস্কারের অভাবে স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। অথচ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ধানুকা মনসাবাড়ি হয়ে উঠতে পারে শরীয়তপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আকর্ষণ।

কেওয়ার ভাঙ্গা মঠ: গাছের শিকড়ে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস
কেউড় ভাঙ্গা মঠে পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে একটি অদ্ভুত দৃশ্য। প্রাচীন লাল ইটের দেয়ালকে যেন একটি বিশাল বৃক্ষ তার শিকড় দিয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে গাছের শিকড় ও মঠের দেয়াল যেন একাকার হয়ে গেছে।

এই অদ্ভুত সহাবস্থান স্থাপনাটিকে দিয়েছে এক রহস্যময় সৌন্দর্য। প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে প্রাচীন স্থাপত্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে ধ্বংসের আশঙ্কা। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে, চারপাশ লতাপাতা ও জংলি গাছে ঢাকা।

প্রকৃতির সঙ্গে ইতিহাসের এই অদ্ভুত মেলবন্ধন নিঃসন্দেহে দর্শনীয়। কিন্তু স্থাপনাটিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ প্রয়োজন।

জামাদ্দার সেলিম মিয়ার বাড়ি: ফটক পেরোলেই অন্য এক সময়
জামাদ্দার সেলিম মিয়ার পুরোনো বাড়ির প্রবেশমুখের প্রাচীন ফটকটি যেন সময়ের একটি দরজা। সেটি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে চারপাশের বর্তমান সময়টাকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাওয়া যায়।

জীর্ণ দেয়াল, ধ্বংসাবশেষ, পুরোনো চুন-সুরকির কারুকার্যময় ভবন—সব মিলিয়ে এখানে রয়েছে এক ধরনের আদিম সৌন্দর্য। পুরো চত্বরটি বেশ নিরিবিলি। গ্রামীণ পরিবেশের শান্তি আর প্রাচীন স্থাপত্যের আবহ একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে আলাদা এক পরিবেশ।

ইতিহাসপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু ও আলোকচিত্রীদের জন্য এটি হতে পারে দারুণ একটি স্থান। প্রয়োজন শুধু যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা।

লায়রা দালান: লতাগুল্মে ঢাকা এক রহস্যময় ভবন
লাকার্তা ফাউন্ডেশন বা লাকার্তা শিকদার বাড়ির ভেতরে অবস্থিত লায়রা দালান। পুরোনো লাল ইটের এই ভবনটি দীর্ঘদিনের অবহেলায় আজ প্রায় প্রকৃতির অংশ হয়ে গেছে।

দালানের দেয়ালের প্লাস্টার খসে বেরিয়ে এসেছে পুরোনো ইট। ছাদ ও চারপাশ ঢেকে গেছে গাছপালা ও লতাগুল্মে। শ্যাওলা জমা দেয়াল, নীরবতা আর ভগ্ন স্থাপত্য মিলিয়ে জায়গাটিতে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় আবহ।

তবে এখানে ভ্রমণকারীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেয়ালে স্পষ্টভাবে লেখা আছে—‘প্রবেশ নিষেধ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিত্যক্ত ভবন’। তাই বাইরে থেকেই স্থাপনাটির ইতিহাস ও স্থাপত্য দেখা উচিত। কৌতূহলবশত ভেতরে প্রবেশ করা বিপজ্জনক।

মহিষারের দিগম্বরী: মন্দির, দীঘি আর কিংবদন্তির জনপদ
ভেদরগঞ্জ উপজেলার মহিষার গ্রাম যেন ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোককথার এক বিস্ময়কর মিলনভূমি। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক দিগম্বরী কালী মন্দির ও দিগম্বরী দীঘি।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মন্দিরটির ইতিহাস বহু শতাব্দীপ্রাচীন। প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ছিল গভীর জঙ্গলে আচ্ছাদিত। তান্ত্রিক সাধকেরা এখানে সাধনা করতেন। পরে এক তান্ত্রিক সন্ন্যাসী এখানে দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে।

মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে মনসা মন্দির, শ্রীশ্রী গঙ্গাধর মহাদেবের মন্দির, শিবলিঙ্গ ও শিবমূর্তি, প্রাচীন বট-অশ্বত্থ গাছ, জোড়া পুকুর এবং লোককথার সঙ্গে জড়িত লক্ষ্মীন্দরের ঘর।

পাশেই রয়েছে বিশাল দিগম্বরী দীঘি।

কথিত আছে, প্রায় ছয়শ বছর আগে বারো ভূঁইয়াদের সময় বিক্রমপুরের জমিদার রাজা চাঁদ রায় দিগম্বরী সন্ন্যাসীদের অনুরোধে প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে দীঘিটি খনন করেন। দিগম্বরী নামের এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বালিকার কাহিনিও এই দীঘির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

লোককথা বলে, মাত্র আট বছর বয়সে বিয়ের আগের দিন দীঘির ঘাটে স্নান করতে নেমে দিগম্বরী রহস্যজনকভাবে জলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরদিন বৈশাখের প্রথম দিনে এক শাঁখারী নাকি নির্জন বটগাছের ভেতর থেকে একটি হাত বেরিয়ে আসতে দেখেন। সেই হাত শাঁখা পরানোর পর নিজেকে দিগম্বরী বলে পরিচয় দেয়—এমন বিশ্বাস স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত।

আরও একটি লোককথা রয়েছে—কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় থালা-বাসন চাইলে নাকি দীঘির পাড়ে এসে প্রার্থনা করলেই পরদিন সকালে সেগুলো জলের ওপর ভেসে উঠত।

১৯৮২ সালে দীঘির জল সেচে আধুনিক খননকাজ চালানোর সময় তলদেশ থেকে ৪২ কেজি ওজনের একটি কষ্টিপাথরের মূর্তিসহ বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়।

বর্তমানে দীঘির চারপাশে রয়েছে দিগম্বরী সন্ন্যাসী বাড়ি, মেলা চত্বর, জোড়া পুকুর ও বিভিন্ন মন্দির। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বিশেষ পূজা হয়। চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বসে মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা।

দিগম্বরীকে বুঝতে হলে শুধু মন্দির দেখা যথেষ্ট নয়। এখানে দাঁড়াতে হয় দীঘির ঘাটে, শুনতে হয় মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা গল্পগুলো। ইতিহাস আর লোকবিশ্বাসের এই মিশ্রণই জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা চরিত্র।

করণ হোগলা: তিন গম্বুজ থেকে এক গম্বুজের স্থাপত্য
নড়িয়া উপজেলার করণ হোগলা এলাকায় পাশাপাশি ছড়িয়ে আছে প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যের একাধিক নিদর্শন।

‘করণ হোগলা চার আনী ৩ গম্বুজ মসজিদ’ স্থানীয় জমিদার মুন্সী মনিরুদ্দিন চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা। প্রায় ৩৩ ফুট দীর্ঘ ও ১৫ ফুট প্রশস্ত মসজিদটির ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। আয়তাকার গঠন, প্রাচীন কারুকাজ, চারপাশের সবুজ গাছপালা এবং পুকুর—সব মিলিয়ে স্থাপনাটি বেশ আকর্ষণীয়।

এর কাছেই রয়েছে একটি পরিত্যক্ত এক-গম্বুজ মসজিদ। ঘন জঙ্গল ও লতাপাতায় ঢাকা এই স্থাপনাটি এখন অনেকটাই বিস্মৃত। অথচ এর প্রাচীন ইটের দেয়াল এখনও ইতিহাসের কথা বলে।

আরও কিছু দূরে রয়েছে ‘বড় বাড়ি মসজিদ’ বা এক গম্বুজ মসজিদ ও হুজরাখানা। মাত্র ১১ বাই ১১ ফুটের এই ছোট মসজিদটির দেয়াল প্রায় ২০ ইঞ্চি পুরু। সামনে রয়েছে দুটি প্রবেশদ্বার। সীমিত জায়গায় একসঙ্গে ইমামসহ সাতজন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর পাশে থাকা প্রাচীন হুজরাখানা। প্রায় ৬ ফুট উচ্চতার এই ছোট ইবাদতকক্ষটির দৈর্ঘ্য ৮ ফুট এবং প্রস্থ ৬ ফুট। একই ইটের গাঁথুনিতে মসজিদের পাশে এমন হুজরাখানা সচরাচর দেখা যায় না।

সামনের ঘাট বাঁধানো পুকুরটি পুরো পরিবেশকে আরও শান্ত ও মনোরম করে তুলেছে।

হায়াত মঞ্জিল: স্থাপত্যে ১৮৪৭-এর স্মৃতি
নড়িয়ার ডিংগামানিক ইউনিয়নের চিশতী নগর দরবার শরীফের অন্যতম আকর্ষণ হায়াত মঞ্জিল। ভবনের ফলক অনুযায়ী, এর নিচতলা নির্মিত হয় ১৮৪৭ সালে এবং দোতলা ১৯০৬ সালে। পরে ২০১৯ সালে ভবনটি সংস্কার করা হয়।

পুরোনো স্থাপত্যশৈলী ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের এক অনন্য সংমিশ্রণ এই প্রাঙ্গণে। ইতিহাসপ্রেমী মানুষের পাশাপাশি যারা নীরবতা ও মানসিক প্রশান্তির সন্ধান করেন, তাঁদের কাছেও জায়গাটি আকর্ষণীয় হতে পারে।

ভোজেশ্বরের শিব মন্দির: একখণ্ড কষ্টিপাথরের বিশাল শিবলিঙ্গ
ভোজেশ্বর ইউনিয়নের ঐতিহাসিক শিব মন্দির সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে একখণ্ড কষ্টিপাথরে খোদাই করা বিশাল একশিলা শিবলিঙ্গ।

স্থানীয়ভাবে এটি উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং এই অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিবলিঙ্গ হিসেবে পরিচিত। কালো পাথরের এই শিবলিঙ্গ দর্শনে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন।

শিব চতুর্দশী ও দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। শরীয়তপুর জেলার অন্যতম বড় দুর্গাপূজার আয়োজনও এখানে হয় বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত।

সৌরভ গাঙ্গুলীর পৈতৃক ভিটা: দেশভাগের স্মৃতির সঙ্গে ক্রিকেটের যোগ
মহিষার গ্রামের একটি প্রাচীন বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় ক্রিকেটের জনপ্রিয় তারকা সৌরভ গাঙ্গুলীর পারিবারিক ইতিহাস।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় তাঁর পূর্বপুরুষেরা এই ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই চত্বরে রয়েছে পুরোনো জমিদারি ঘর বা অট্টালিকা, ঘাট বাঁধানো পুকুর এবং কারুকার্যময় প্রাচীন মন্দির।

দেশভাগের পর সম্পত্তিটি সরকারি নিলামের মাধ্যমে বর্তমান মালিকেরা কিনে নেন। তাঁরা এখনও আন্তরিকতার সঙ্গে এখানে বসবাস করছেন। সৌরভ গাঙ্গুলী নিজে এখানে না এলেও তাঁর পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা এই স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিদর্শন করেছেন।

একজন ক্রিকেটারের পূর্বপুরুষের ভিটা—এই পরিচয় যেমন মানুষের আগ্রহ তৈরি করে, তেমনি বাড়িটির স্থাপত্য ও দেশভাগের ইতিহাসও এটিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।

আরও যে ইতিহাসগুলো অপেক্ষা করছে
শরীয়তপুরের ঐতিহ্যভ্রমণ এই কয়েকটি স্থাপনায় শেষ নয়। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

রুদ্রকর জমিদার বাড়ি, ছয়গাঁও জমিদার বাড়ি, কার্তিকপুর জমিদার বাড়ি, ফতেহজংপুর দুর্গ এবং পুরাতন কাছারি ঘর বা কোদালপুর কুটির—সবগুলোই শরীয়তপুরের জমিদারি ও প্রশাসনিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ধর্মীয় ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ চাকদহ হিন্দু মঠ, কমলা মাধব মেমোরিয়াল টেম্পল, পরমদয়াল শ্রীশ্রী রামঠাকুরের পবিত্র জন্মস্থান, শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণের সেবা মন্দির, শ্রীশ্রী রামঠাকুর মন্দির, শ্রীশ্রী দুর্গা মন্দির এবং ঐতিহাসিক শিব মন্দির।

মুসলিম স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে বুড়িরহাট ঐতিহাসিক জামে মসজিদ, কার্তিকপুর জমিদার বাড়ি মসজিদ, লাকার্তা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, লাকার্তা ইসলামিক সেন্টার, হায়াত মঞ্জিল, নিজামুদ্দিন আউলিয়া ভবন ও চিশতী নগর।

এ ছাড়া কবি রথীন্দ্র ঘোটক চৌধুরীর বাসভবন, লাকার্তা ফাউন্ডেশন বা লাকার্তা শিকদার বাড়ি, ভোজেশ্বর ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ঐতিহাসিক মাতৃসদনও জেলার ঐতিহ্য ও সামাজিক ইতিহাসের অংশ।

ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দায়
শরীয়তপুরের এসব স্থাপনা দেখলে একটি বিষয় বারবার মনে হয়—আমরা ইতিহাসের খুব কাছাকাছি থেকেও তাকে কতটা অবহেলা করি।

একটি প্রাচীন মঠের দিকে যাওয়ার রাস্তা নেই। একটি শতাব্দীপ্রাচীন জমিদারবাড়ি ভেঙে পড়ছে। কোনো মঠ গাছের শিকড়ে বন্দী। কোনো ভবনকে ঘিরে সতর্কবার্তা—‘প্রবেশ নিষেধ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিত্যক্ত ভবন’। কোনো প্রাচীন মসজিদ ঘন জঙ্গলে হারিয়ে যাচ্ছে।

অথচ সঠিক পরিকল্পনা, সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এসব স্থান হয়ে উঠতে পারে ঐতিহাসিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এ জন্য শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি স্থাপনার ইতিহাস নথিভুক্ত করতে হবে। প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা, তথ্যফলক, পরিচ্ছন্নতা, সীমানা নির্ধারণ এবং বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ।

সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় মানুষকে এই ঐতিহ্যের অংশীদার করতে হবে।

বিদেশের পর্যটনকেন্দ্রের ছবি দেখে মুগ্ধ হওয়ার আগে নিজের দেশের অজানা ইতিহাসের দিকে তাকানো দরকার। একটি ভ্রমণ কেবল আনন্দ দেয় না; স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করে, মানুষের জীবনে আয় তৈরি করে এবং একটি ঐতিহাসিক স্থাপনাকে বাঁচিয়ে রাখার সামাজিক শক্তি তৈরি করে।

শরীয়তপুরের পথে পথে ছড়িয়ে থাকা এসব মঠ, মন্দির, মসজিদ, জমিদারবাড়ি, দুর্গ, দীঘি ও পুরোনো ভবন আসলে আমাদেরই উত্তরাধিকার। এগুলো কেবল অতীতের ধ্বংসাবশেষ নয়—এগুলো আমাদের পরিচয়ের দলিল।

আজ যদি আমরা সংরক্ষণ না করি, কাল হয়তো কেবল লোককথায় তাদের নাম শুনব।

তাই ইতিহাসের পথে বেরিয়ে পড়ুন। শরীয়তপুরকে নতুন করে দেখুন। ভাঙা ইটের দেয়াল, শ্যাওলা ধরা মঠ, পুরোনো পুকুরের ঘাট কিংবা কোনো জমিদারবাড়ির নিঃসঙ্গ ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে একবার ভাবুন—এই জায়গাগুলো একদিন মানুষের জীবন, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও স্বপ্নের কেন্দ্র ছিল।

সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই দায়িত্ব। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব।
লেখক : পরিব্রাজক, ব্যাংকার।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology